অর্ধকুম্ভ মেলা ঘুরে এলাম সেই ২০১৯ ফেব্রুয়ারী তে আর তা নিয়ে কতো না হৈচৈ করেছি ফেসবুকে, নিজের এবং গ্রুপগুলোর দেওয়ালে ! অনেক বন্ধুরা আমায় এই যাত্রা নিয়ে লিখতে বলেছিলেন । তাই আর দেরি নয় ।যখন যাওয়ার কোনো ঠিক ঠিকানা ছিলোনা তখন বেশ ঘন ঘন লিখেছি ফেসবুকে।এই বলে যে অর্ধ কুম্ভ শুরু হয়ে গেল আর আমি যেতে পারলামনা ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’। এই কথাটা কিন্তু কালকূটের লেখা আমার প্রিয় বইয়ের নাম ! অনেকেই কেন কেওই যান নি অন্তত আমার  বাংলা ফেইসবুক গ্রুপগুলোর জানা চেনা মানুষের মধ্যে , তাই আমার দুঃখটা বা আক্ষেপ করাটা বেশ একচেটিয়া রয়ে গিয়েছিলো আর তা নিয়ে কেওই কিছু ভালো বা মন্দ মন্তব্য  করেননি। তিন দশকের ও বেশি বছর এদেশে আছি তার মধ্যে কয়েকটা অর্ধ-কুম্ভ ও পূর্ণকুম্ভ হয়ে গিয়েছে কিন্তু আমার আর কোনোটাই যাবার সুযোগ হয়নি ! 

অনেকেরা  বলবেন আমাদের ও তো যাওয়া হয়নি , এ নিয়ে এতো  হাপিত্যেশ করার কি আছে ? আমার আছে, কারণ এলাহাবাদের বা প্রয়াগরাজের অর্ধ-কুম্ভ মেলা  বা পূর্ণ-কুম্ভ মেলা  যেন আমার নিজস্ব , আমার ঘরের কুম্ভমেলা, আমার শহরের কুম্ভমেলা । এলাহাবাদ যে আমার বড়ো হওয়ার শহর আর সেখানে এতো বড়ো উৎসব , সারা পৃথিবী থেকে লোকজন জড়ো হচ্ছে আর আমি কিনা বিদেশে থাকি বলে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবে একদিনের জন্যেও যোগ দিতে পারবোনা?

শুরু হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ জনসমাগম। দুই মাস ধরে এই যজ্ঞ চলবে। এক জায়গায় তো হয়না কুম্ভমেলা ! নিয়ম মতন হরিদ্বার , উজ্জয়ন ,নাসিক এ ও হয়ে, যদিও একসময় নয়।! সে নিয়ে আমার একটুও মাথা ব্যাথা হয়েনা তো ? কারণ বলতে কোনো সংকোচ ও নেই যে আমি তেমন ধার্মিক নয়, আবার যে আমি অধার্মিক তাও নই । আসলে আমার বড়ো হওয়া জায়গায় বৃহত্তম উৎসব হবে , পৃথিবী শুধ্যূ লোকজনের মহাসমাবেশ হবে আর আমি যেতে পারবোনা? এবছর নয় আসছে বছর , তাও তো হবেনা । আবার ৬ বছরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। না যাওয়ার একমাত্র কারণ যে কাজ ,পড়ানোর কাজ ! আগে ফুল টাইম স্কুল টিচার , এখন পার্ট-টাইম কলেজ টিচার হলেও তো যেতে হবে কাজে। ছুটি পাওয়া যাবেনা।ইতিমধ্যে র্প্রতিদিন বিবিসি খবরগুলোতে এ বিস্তারিত ভাবে দেখছি , এলাহাবাদের কুম্ভমেলায় এই হচ্ছে , সেই হচ্ছে, ১৫ কোটি লোকের সমাগম হবে, এবারের কুম্ভনগর চারটি ছোট দেশের মাপের হবে। এটাও জানলাম যে কুম্ভমেলা কে আখ্যা দেয়া হয়েছে,  ‘The Intangible Cultural Heritage of Humanity ‘  by UNESCO !

কুম্ভমেলাতে লোকে কিছু চাইবার বা চাওয়া -পাওয়ার আশায় আসেনা, এতো সব অন্বেষী লোকেদের সমাগম হয়ে শুধুমাত্র নিজের বর্তমান স্তরের অস্তিত্বর ওপরে যাওয়ার আকাঙ্খার উদেশ্যে সেটা  সচেতন ভাবেই হোক বা অসচেতন ভাবেই হোক।  মন খারাপ হয়ে চলেছে , এদিকে একের পর এক শাহী স্নানগুলো মানে মাহাত্ম্যের  স্নান , একের পর এক হয়ে চলেছে, হতাশা বাড়ছে  – মকর সংক্রান্তি স্নান হয়ে গেল , মৌনিঅমাবস্যা স্নান হয়ে গেলো, বসন্তপঞ্চমীর স্নান ও হয়ে গেলো। অথচ যেতে পারছিনা বলে আবার এইসব নিয়ে ঘাঁটাঘঁটিও করা ও তো ছাড়ছিনা।কলেজের টাইমেটেবিল  এ নজর দিয়ে  দেখি আমার ১১ দিনের হাফ-টার্ম এর ছুটি পড়ছে। এমনিতে পাক্কা একসপ্তাহ ছুটি + শনি -রবি । যেহেতু আমি পার্ট- টাইম কাজ করি, আরো কটাদিন আমি হাতে পাবো । তার মধ্যে আবার একটি শাহী স্নান ও পড়েছে ১৯ ফেব্রুয়ারী তে । মাঘী পূর্ণিমার স্নান। তখন আমার ছুটি চলবে !বসন্ত পঞ্চমীর পরে, কুম্ভ মেলার পঞ্চম স্নান হল মাঘী পূর্ণিমার স্নান।  প্রচলিত আছে যে, এই দিন সমস্ত  দেবতারা স্বর্গ থেকে ত্রিবেণী সঙ্গমে এসে উপস্থিত হন। অন্যদিকে, মাঘমাসের পূর্ণিমাকে কল্পবাসের পূর্ণতার পর্বও বলা হয়। কারণ এই দিন যারা কঠোর কল্পবাসের ব্রত করেন তারা সঙ্গমে স্নান করেন। সেই সময় যেতে পারলে ষোলো কলা পূর্ণ।  ব্যাস, মুশকিল আসান মনে হোল।

বাড়িতে বললাম যে আমি যাবো , আমার যাওয়ার অদম্য ইচ্ছাটি দেখে কেও আর কিছু বলার সাহস করলোনা । দেখলাম বেশ বহাল তবিয়তে আমার ইচ্ছা পূরণ হবার সুযোগ এসে গেছে ।এলাহাবাদের কোনো ডাইরেক্ট ফ্লাইট নেই , তাই কলকাতা হয়ে যাওয়াটা স্থির করলাম । অনলাইন এ টিকেট কাটলাম কাতার এয়ারলাইন্স এর লন্ডন থেকে কলকাতার । তারপর চাই ডোমেস্টিক ফ্লাইট কলকাতা থেকে এলাহাবাদ রিটার্ন । তাই কাটলাম । টিকেট কাটা, হোটেল বুক করা , টুর বুক করা , এই সব কাজ আমার কাছে কোনো বড়ো ব্যাপারই  নয় । কারণ এই সব কাজ খুব কম হয়ে থেকে  আমি দেশে থাকতে কলেজে পড়াবার সময়ে স্টাফদের সাথে টুর করবার সময়ে ও আমি করতাম। পরে জেনেছি, আমি চলে আসার পর আর ওরা আর কোনো টুর এ যায়নি! আর এদেশে এসেও বাড়ি থেকে টুরের সব কিছু আমি করে আসছি চিরকাল । তাই এই সব হুজ্জতি আমার কাছে  কোনো ব্যাপারই  নয় । টিকেট কাটতে গিয়ে দেখি এয়ার ইন্ডিয়া আবার প্রতিদিন কলকাতা থেকে এলাহাবাদের ডাইরেক্ট ফ্লাইট নেই! যাক আমি ১৭ তারিখের টিকেট কাটলাম।যখন কলকাতা থেকে প্লেন এ ওঠবার আগে এয়ারপোর্ট এ লাউঞ্জে এ একা বসে আছি , দেখি প্রচুর হৈ হৈ হচ্ছে , আমাকে ছাড়া অনেকে, অনেক কে চেনে এবং বেশির ভাগ হিন্দি তে কথা বলছেন । বাঙালিরা ও আছেন তবে তাঁরা একরকম দল বেঁধে যাচ্ছ না তাই  তাঁদের রব শোনা  যাচ্ছিলনা কয়েকজন নিজের পরিবার ছাড়া একা যাচ্ছেন তাদের ও সঙ্গী আছেন । আমার যা স্বভাব চুপচাপ বসে থাকতে পারিনা , যখন যাত্রা করি . ঠিক কথা বলি , কোথায় যাচ্ছেন ইত্যাদি ।

কথাবার্তার প্রসঙ্গে  আমি যেই একজন কে বললাম আমি যুক্ত রাজ্য থেকে এসেছি শুধু কুম্ভ মেলা দেখবো , তখন সঙ্গে-সঙ্গে আর এক মহিলার সাথে পরিচয় করিয়ে বললেন , ইনিও আমেরিকা থেকে এসেছেন এই কুম্ভ মেলা দেখবেন বলে। যদিও তিনি একা আমেরিকা থেকে কিন্তু সঙ্গে সব দেশের আত্মীয় স্বজনরা আছেন ! সবাই বেশ হৈ হৈ রৈ রৈ করছে। যাত্রীরা শুধু বয়স্করা বা যুবক-যুবতীরাই নয় , অনেক কিশোর -কিশোরীরাও ছিল। আপোস কথাবার্তা তে বুঝলাম মামা , পিসি , ঠাকুমা সবাই মিলে এসেছে ! তারপরে আবার এক পরিবারের আরেক পরিবারে সাথে দেখা হয়ে যাওয়া তে ও আলাপ-আলোচনা  চলছে। সবথেকে আশ্চর্য লাগলো , আমি আজ অবধি এতজন (Wheelchair Users )কে একই প্লেন এ উঠতে দেখিনি ! কত বড়ো-বড়ো জাম্বো এরোপ্লেনে এ উঠেছি দুজন বা তিন জনের বেশি দেখিনি  আর এই এলাহাবাদগামী  এরোপ্লেনে এ কম করে হলেও ১০ জন ছিলেন। কথাবার্তায় জানলাম বেশির ভাগ যাত্রীরা শুধু দু দিনের জন্যে যাচ্ছেন । তারা আমার মতন কোনো শাহী স্নান করবেননা।এরোপ্লেনে এ উঠে আর এক নতুন অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি হলো । প্লেন ভর্তি লোক সবাই যাচ্ছেন কুম্ভমেলা দেখতে এবং সবার সাথে সঙ্গী-সাথী আছে, আমি একা! অথচ এক সেকেন্ডের জন্যেও মনে হলোনা যে আমি একা । এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞাতা।

সাধারণত  প্লেন উঠলে হয়তো পাশে বসা  যাত্রী  সাথে ছাড়া আর কারোর সাথে কথা হয়না! এ যাত্রায় সবাই একটা হৈ হৈ রৈ রৈ ভাব। যেন সবাই এক পরিবারের। বেশ উপভোগ করছিলাম যাত্রা টা ! দুই সীট ছাড়িয়ে এক বাঙালি মহিলা আমাকে বললেন যে তাঁর ছেলে তাঁকে হটাৎ করে টিকেট কেটে যাবার ব্যাবস্থা করে দিয়েছে ! এলাহাবাদ এয়ারপোর্ট এ তাঁর ভাগ্নি থাকবে। সেই তাঁকে মেলায়ে নিয়ে যাবে।প্লেনে বসে দেশের উন্নতির নমুনা দেখলাম । আমার আশেপাশে এবং পেছনে বসা সীটের যুবতীরা আপোসে যেসব কথাবার্তা বলছেন সেটা শুনে বুঝলাম তারা খুবই স্বচ্ছল পরিবারের, বাচ্চার জন্যে ঘনঘন গিয়ে ডাক্তারের কাছে থেকে তার ডায়েট চার্ট করিয়ে আনা, একজন বললেন যে তারা চার্টার প্লেন নিয়ে টার্কি তে ভাইয়ের বিয়ে দিতে যাচ্ছেন কিছুদিন পরে! বেড়ানো হবেনা বেশি, কারণ বরযাত্রী হয়ে যাচ্ছেন , ওদের চার্টার প্লেনে  করে ফিরতে হবে.। যতই শুনি ততই আনন্দ হয়ে । এইতো কিছু লোক তো এতটা স্বচ্ছল হয়েছে যে তারা চার্টার প্লেন নিয়ে অন্য দেশে গিয়ে বিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন ।

ছবি: নিনারা

দ্বিতীয় পর্ব