২০২১ সালের ২৬শে মার্চ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করবে। আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো, এই বছরেই উদযাপিত হতে যাচ্ছে “জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান”-এর জন্মশতবার্ষিকী, যিনি একক ও দৃঢ়ভাবে স্বৈরাচার ও নৃশংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং গণতন্ত্রের স্বাধীনতার মূল নীতিগুলিকে বাঙালির হৃদয়ে বাঁচিয়ে রেখে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

ত্রুটিযুক্ত দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হওয়ার পরপরই পূর্ব উইং পূর্বকল্পিত এবং পূর্বনির্ধারিত দমন ও পরাধীনতার শিকার হয়েছিল। পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মহম্মদ আলি জিন্নাহ তার প্রথম ভ্রমণেই প্রথম আঘাতের সূত্রপাত করেছিলেন, যখন তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে “উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা“। এই ঘোষণা পাকিস্তানের অর্ধেকেরও বেশি জনগণের অনুভূতি এবং আকাঙ্ক্ষাকে পুরোপুরি ক্ষুণ্ণ করে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ নাগরিকরা তাদের মাতৃভাষা বাংলার প্রতি ভালবাসার বহিঃপ্রকাশে এবং প্রশংসার দাবিতে একটি রাজপথে প্রতিবাদ আন্দোলন করেছিল। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্দোলনকারীদের তাদের আন্দোলনের মূল্য দিতে হয় যখন অত্যাচারী আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি ঠান্ডা মাথায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালায়। সেই থেকে, যারা বাংলা ভাষা নিয়ে সংগ্রাম করেছিল, যারা পূর্ব পাকিস্তানের মুখ থেকে বাঙালি পরিচয় যেন না হারিয়ে যায় তা নিশ্চিত করেছিল, তাদের সম্মান দিতে উদ্যোগী হয় রাষ্ট্রপুঞ্জ। ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

পশ্চিম পাকিস্তান পুঁজি, রাজস্ব এবং ধন-সম্পদের সিংহভাগ উপভোগ করতো (বিশেষ করে পাটজাত শিল্প থেকে যে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন হত)। পূর্ব পাকিস্তানিদের মনে পশ্চিমাদের স্থূল পক্ষপাত, গোঁড়ামি এবং অসহিষ্ণু ব্যবহারের কারণে বিরূপ প্রভাব দেখা যায়। পশ্চিম পাকিস্তানীরা ছিল প্রধানত পাঞ্জাবি। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড় ভোলা পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলে আঘাত হানে এবং প্রায় ৫ লক্ষ মানুষের প্রাণ হানি হয়। এমন জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে সাহায্য ও উদ্ধারকাজে দায়িত্বপালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় পশ্চিম পাকিস্তান প্রশাসন। তাদের অজ্ঞতা এবং দক্ষতার অভাব পূর্ব ও পশ্চিমাদের মধ্যকার বিভাজনকে আরও গভীর করে তোলে।

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের ইতিহাসের সম্ভবত একমাত্র সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লিগ ৩০০ সদস্যের মধ্যে ১৬০টি আসনেই অপ্রতিরোধ্যভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাকিস্তানের পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য তারা প্রস্তুত ছিল। কিন্তু এক গভীর ষড়যন্ত্র গণতন্ত্রের প্রবাহকে বাধা দেয় এবং এভাবেই ভারতীয় উপমহাদেশে চিরতরে ইতিহাসের দিক পরিবর্তন হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের বর্বর সামরিক নৃশংসতার সময়ে পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে কয়েক হাজার নিরীহ পুরুষ, মহিলা এবং শিশুকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়। এটি অনুমান করা হয় যে, প্রায় এক কোটি শরণার্থী স্বৈরাচারী শাসনের হাত থেকে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

অপারেশন সার্চলাইটের রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয় এবং তখন পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে তাঁর উপর নির্যাতন ও হত্যার গুজব রটে। মৃত্যু আসন্ন জেনেও তিনি দৃঢ় ও সাহসী ছিলেন। তাঁর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাশে ছিলেন ভারতের লৌহমানবী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের মানুষেরা যে স্বাধীনতার জন্য এতদিন প্রাণপণ সংগ্রাম করেছে তা নিশ্চিত করতে তিনি যা কিছু সম্ভব এবং যা কিছু প্রয়োজন তার সবটাই করবেন। মুজিবরকে মুক্ত করতে হাল ছাড়বেন না, যাতে তিনি তাঁর দেশের জনগণের কাছে একজন আদর্শ নেতা হিসেবে ফিরে যেতে পারেন।

মুক্তি বাহিনী অনেক আগে থেকেই সক্রিয় ছিল। তবে 26 শে মার্চ অপারেশন সার্চলাইট আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার সাথে সাথে সাধারণ মানুষ , ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার, পূর্ব পাকিস্তানিদের সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সৈনিকেরা যোগ দিতে শুরু করেন। বলা যেতে পারে 26 শে মার্চ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিন। মুক্তিবাহিনীর নেতারা সাহায্যের জন্য ভারতের কাছে আবেদন করেন। শ্রীমতি গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ এন্ড এনালিটিক্যাল উইং অফ ইন্ডিয়ান আর্মি (R&AW)এবং কোভার্ট অ্যাকশন ফোর্সেস যেমন তিব্বতিদের নিয়ে তৈরী বিকাশ বাহিনী , মুক্তিবাহিনী সদস্যদের প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ শুরু করে। হাতে নতুন অস্ত্র এবং হৃদয়ে স্বাধীনতা নিয়ে মুক্তি বাহিনী পাকিস্তানের ডিফেন্সিভ পোস্টগুলোতে একের পর এক চোরাগোপ্তা আক্রমণ করতে থাকে । ৩ রা ডিসেম্বর, পশ্চিম পাকিস্তানি বিমান বাহিনী পশ্চিম এবং উত্তর ভারত জুড়ে ভারতীয় বিমানবন্দরগুলিতে আক্রমণ করলে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে প্রবেশ করে। শুরু হয় আধুনিক কালের দক্ষিণ এশিয়ার সব চেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ।হাজার হাজার ভারতীয় এবং অগুনতি মুক্তি যোদ্ধা, সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের পরে ১৬ ই ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সামনে পাকিস্তান ৯০,০০০ সৈনিক সহ জনসমক্ষে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। মুক্তি যোদ্ধারা আমাদের বিশ্বখ্যাত ফ্রেঞ্চ রেসিস্টেন্স এর কথা মনে করিয়ে দেয় যারা কিনা গেরিলা যুদ্ধে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন।

এই বছর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর। এই ঐতিহাসিক সময় হাজার হাজার মানুষের রক্ত ও আত্মত্যাগের স্বাক্ষর বহন করছে। সেই ইতিহাস যা দুই প্রতিবেশীর প্রাণশক্তি, দৃঢ় প্রত্যয়, গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদেরও সাক্ষ্য বহন করছে। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক স্থলসীমা চুক্তি স্বাক্ষরপূর্বক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা হয় এবং ছিটমহলগুলির বিনিময় বিশ্বের অন্য কোন দেশ কখনো করেনি। সম্ভবত এটিই একমাত্র উদাহরণ যেখানে উভয় দেশের মধ্যে শান্ত ও মৈত্রীমূলক সমাধান স্থাপন করে ভৌগোলিক সীমানাগুলি বুলেটমুক্ত করা হয়।

বিশ্ব যখন মহামারী কোভিড ১৯ এর সর্বনাশা কবলে, ভারত বিশ্বকে এই ভ্যাকসিন সরবরাহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ভারত এবং বাংলাদেশের বন্ধুত্ব একটি নতুন মাত্রা পায় যখন ভারত দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকেই সবচেয়ে বেশি কোভিড ১৯ ভ্যাকসিন সরবরাহ করে। পাশাপাশি, নতুন আন্তর্জাতিক আন্তঃসীমানা সংযোগ প্রকল্পগুলি (মৈত্রী সেতু) কেবলমাত্র বাণিজ্যই নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগকে আরও বিকশিত করার জন্য দ্রুত গতিতে উন্নত হচ্ছে যা সম্প্রীতি এবং সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই সম্পর্কের মূল। আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক উদযাপিত হবে ২০২১ সালের ২৬শে মার্চ, যখন বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে উপস্থিত থাকবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, দুটি দেশই ঠিক অর্ধ শতাব্দী আগে একাত্তরে রুখে দাঁড়িয়েছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। এই বন্ধনের তাৎপর্য সর্বকালের এবং এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুটি পরিণত গণতন্ত্রের সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে এবং একযোগে সম্ভাবনা ও সাফল্যের পথে একে অপরের পরিপূরক হবে।

ছবি: ইন্টারনেট