বারো মাসে তেরো পার্বণ – এই প্রায় প্রবাদবাক্যটি বাংলার জনমানসে সুবিদিত। এই পার্বণগুলির মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য হল কার্তিক মাসে (অথবা ইংরেজি November মাসে) অনুষ্ঠিত দেবী জগদ্ধাত্রী পূজা। জগদ্ধাত্রী পূজা বাঙালি হিন্দু সমাজের একটি বিশিষ্ট ধর্মীয় অনুষ্ঠান। বাঙালি হিন্দুদের ধর্মীয় মানসে রাজসিক দেবী দুর্গা ও তামসিক দেবী কালির পরেই স্থান সত্ত্বগুণের দেবী জগদ্ধাত্রীর। বিশেষত, নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর এবং হুগলী জেলার চন্দননগরে আয়োজিত পূজা, গোটা বাংলায় তো বটেই, এমনকি সমগ্র ভারতবর্ষেও সুবিখ্যাত।

অনেকেই হয়তো শুনে থাকবেন যে খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতকে নদীয়ার নৃপতি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায়, বাংলার মাটিতে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন শুরু হয়। কিন্তু এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতকের খ্যাতনামা পণ্ডিত শূলপাণি রচিত কালবিবেক গ্রন্থে কার্তিক মাসে জগদ্ধাত্রী পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়। পূর্ববঙ্গের বরিশালে, খৃষ্টীয় অষ্টম শতকে নির্মীত দেবী জগদ্ধাত্রীর একটি প্রস্তরমূর্তি পাওয়া যায়, যেটি বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহশালার প্রত্নতত্ত্ববিভাগে রক্ষিত।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের শাসনকালের পূর্বে নির্মীত, নদীয়ার জলেশ্বরের শিবমন্দির ও কোতোয়ালি থানার রাঘবেশ্বর শিবমন্দিরের ভাষ্কর্যে দেবী জগদ্ধাত্রীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

তবে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আগে জগদ্ধাত্রী পূজা বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। শুধু কিছু বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ গৃহে দুর্গাপূজার পাশাপাশি দেবী জগদ্ধাত্রীরও উপাসনা করা হত।

কিন্তু কে এই দেবী জগদ্ধাত্রী? হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বা শাস্ত্রে এই দেবীর কি পরিচয় পাওয়া যায়?

এ বিষয়ে একটু তলিয়ে দেখলে পাওয়া যাবে যে বিভিন্ন তন্ত্র ও পুরাণে দেবী জগদ্ধাত্রীর উল্লেখ আছে। কেন উপনিষদেও দেবী জগদ্ধাত্রীর দেখা মেলে; এখানে তিনি উমা হৈমবতী নামে উল্লিখিত। এখানে উমা হৈমবতীর উপস্থাপনা একটি ছোট কাহিনীর মাধ্যমে করা হয়েছে –

হিন্দু দর্শনের সর্বোচ্চ স্তরে আমরা পাই ব্রহ্মকে, যিনি জগতের প্রতিটি জীব ও জড় পদার্থের স্রষ্টা, প্রতিটি জীবের আত্মাস্বরূপ এবং প্রকৃতির সমস্ত শক্তির উৎস। জগতে বসবাসকারী জীব অজ্ঞতাবশত মনে করে তার ইহজীবনের সমস্ত কর্ম এবং সিদ্ধান্তের কর্তা সে নিজেই, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মের ইচ্ছা ছাড়া একটি গাছের পাতাও নড়ে না। একদা দেবাসুরের যুদ্ধে জয়লাভ করে, দেবতারা আত্মগর্বে অভিভূত হয়ে পড়েন। নিজেদের অজ্ঞতাবশত তাঁদের ধারণা হয় বিজয়ের মহিমা তাঁদেরই। তখন ব্রহ্ম যক্ষরূপে দেবতাদের নিকটে অবতীর্ণ হন এবং প্রমাণ করে দেন যে ব্রহ্মের কৃপা ছাড়া মহাশক্তিধর অগ্নি বা বায়ু একটি সামান্য তৃণও পোড়াতে বা উড়িয়ে দিতে অপারগ। এইভাবে ব্রহ্ম অগ্নি ও বায়ুর আত্ম অহঙ্কার চূর্ণ করে দেন। অবশেষে দেবরাজ ইন্দ্র আত্ম অহঙ্কার বিসর্জন দিয়ে যক্ষের স্বরূপ জানতে চাইলেন। ইন্দ্রকে আত্মজ্ঞান লাভের উপযুক্ত মনে করে ব্রহ্ম উমারূপিণী ব্রহ্মবিদ্যাকে আবির্ভূত করালেন। এইভাবে ইন্দ্রের হৃদয়ে নির্মল বিবেকবুদ্ধির উদয় হল, তিনি বুঝতে পারলেন বিশ্বের সমস্ত ক্রিয়া ও শক্তির উৎস ব্রহ্ম ব্যতীত আর কেউ নয়। এই স্ত্রীরূপিণী ব্রহ্মবিদ্যাই সমস্ত সৃষ্টির আদি শক্তি, ইনিই দেবাদিদেব মহেশ্বরের সহধর্মিনী, ইনিই হিন্দু ধর্মের শাক্তধারার আরাধ্য দেবী দুর্গা। দেবী জগদ্ধাত্রী মা দুর্গারই সাত্ত্বিক রূপ।

দেবী জগদ্ধাত্রীর বাহন সিংহ, যার পদতলে শায়িত হস্তীরূপী করীন্দ্রাসুর। জগদ্ধাত্রী জগতের রক্ষাকর্ত্রী দেবী, তিনি করীন্দ্রাসুরনিসুদিনী, মাহেশ্বরী, শাক্তচারপ্রিয়া ও আঁধারভূতা নামেও পরিচিত। দেবী ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা, হাতে শঙ্খ-চক্র-ধনুক-বাণ। কন্ঠে নাগযজ্ঞোপবীত। দেবীর গাত্রবর্ণ উদীয়মান সূর্যের মতো।

জগদ্ধাত্রী পূজার অনেক প্রথাই দুর্গাপুজার অনুরূপ। দুটি পূজা পালন করা হয় – দুর্গাপুজার ধাঁচে সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত অথবা নবমীতেই তিনবার সপ্তমী-অষ্টমী-নবমীর পূজা সম্পন্ন করা।

নদীয়া জেলার সদর কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। কিংবদন্তী অনুসারে, নবাব আলিবর্দী খান, রাজার কাছে ১২ লক্ষ টাকার খাজনা দাবি করেন। এত খাজনা জোগাড় করতে অপারগ হলে, নবাবের আদেশে রাজাকে বন্দী করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মুক্তিলাভ করে নদীপথে কৃষ্ণনগরে প্রত্যাবর্তনের সময় নদীর ঘাটে মা দুর্গার বিসর্জনের বাজনা শুনে রাজা বুঝতে পারেন যে সেই বৎসরের মতো দুর্গাপূজার সময় পেরিয়ে গিয়েছে।

বাংলার সর্বপ্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে না পেরে, রাজা বিষন্নচিত্তে রাজপ্রাসাদে ফিরে আসেন। জনশ্রুতি আছে যে সেই রাতে রাজা এক অপরূপা কুমারী নারীকে স্বপ্নে দর্শন করেন যিনি পরবর্তী শুক্লানবমী তিথিতে তাঁর পূজা পালন করতে বলেন। রাজা বুঝতে পারেন না তিনি কোন দেবীর দর্শন লাভ করেছেন। তখন তিনি প্রখ্যাত তন্ত্র সাধক কালিশঙ্কর মৈত্রের কাছে স্বপ্নের বর্ণনা দেন। কালিশঙ্কর মৈত্র স্বপ্নের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলেন যে কুমারী নারীর বেশে দেবী জগদ্ধাত্রী রাজাকে দর্শন দিয়েছেন। প্রায় ২০০০ বৎসর পূর্বে দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় জনগোষ্ঠির মধ্যে এই দেবীর আরাধনার প্রচলন ছিল। দেবী জগদ্ধাত্রী দুর্গারই একটি রূপ, কাজেই তাঁর পূজা শাস্ত্রমতে দুর্গাপুজারই সমতুল্য।

তন্ত্র সাধকের ব্যাখ্যা শুনে, ১৭৫৪ খৃষ্টাব্দে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ীর পূজার সূচনা করেন। শোনা যায় রাজার অনুরোধে কালিশঙ্কর মৈত্র স্বয়ং পূজার পৌরহিত্য করেন। সেই থেকে, আড়াইশো বৎসর অতিক্রান্ত করে, কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ীর ঐতিহ্যময় জগদ্ধাত্রী পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি, হুগলী জেলার অন্তর্গত চন্দননগর ছিল ফরাসি শাসিত। চন্দননগরের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বিশিষ্ট বন্ধু। কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ীতে জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনার সময় ইন্দ্রনারায়ণ সেখানে আমন্ত্রিত হন। পূজা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে, ইন্দ্রনারায়ণ চন্দননগরের লক্ষ্মীগঞ্জ চাউলপট্টিতে দেবী জগদ্ধাত্রীর পূজা আরম্ভ করেন। এই পূজা চন্দননগর আদি পূজা নামে পরিচিত। আজও, চৌধুরী পরিবারের উত্তর পুরুষরা প্রতি বৎসর এই পূজার আয়োজন করেন।

১৭৭২ খৃষ্টাব্দে, রাজবাড়ীর দেখাদেখি, কৃষ্ণনগরের চাষাপাড়ায়, প্রজারাও জগদ্ধাত্রী পূজা আরম্ভ করেন। বুড়িমার পূজা নামে পরিচিত এই পূজা শুরু হয় ঘটে ও পটে। প্রথমদিকে, স্থানীয় গোয়ালারা দুধ বিক্রির উপার্জিত অর্থ দ্বারা পূজার আয়োজন করতেন। ১৭৯০ নাগাদ গোবিন্দ ঘোষ ঘট-পটের পরিবর্তে, প্রতিমা গড়ে পূজার সূচনা করেন। বর্তমানে এই প্রতিমাটি প্রায় ৭৫০ ভরি স্বর্ণালঙ্কারে সুসজ্জিত।

এছাড়াও কৃষ্ণনগরে আরো দুই শতাধিক বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পূজা আয়োজিত হয়।

বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটি গ্রামে, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সহধর্মিনী সারদা দেবীর জন্মস্থানের জগদ্ধাত্রী পূজাও খুবই উল্লেখযোগ্য। পূজা উপলক্ষ্যে জয়রামবাটিতে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়। সারদা দেবীর পৈতৃক গৃহে এই পূজার আয়োজন করে রামকৃষ্ণ মিশন। ১৮৭৭ খৃষ্টাব্দে সারদা দেবীর জননী শ্যামাসুন্দরী দেবী তাঁর বাসভবনে এই পূজার শুভারম্ভ করেছিলেন।

ধীরে ধীরে দেবী জগদ্ধাত্রীর মহিমা, কৃষ্ণনগর ও চন্দননগরের সীমানা অতিক্রম করে গোটা বাংলার গ্রাম এবং শহরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলার বাইরে, উড়িষ্যার বারিপদায়, জগদ্ধাত্রী মেলা একটি সুপ্রসিদ্ধ ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আজ, ভারতবর্ষের বিভিন্ন বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে, এমনকি বিদেশেও জগদ্ধাত্রী পূজা জনপ্রিয়তা লাভ করে চলেছে।

উৎসবপ্রিয় বাঙালি জাতির এই বর্ণাঢ্য ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পার্বণটি আরও বহু যুগ ধরে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে পালিত হোক, সর্বান্তকরণে সেই আশা করি। বর্তমান যুগের অতি দ্রুতগতির, বস্তুবাদী জীবনযাত্রার মাঝে, এই সুপরিচিত সামাজিক অনুষ্ঠানগুলি, একটি জনগোষ্ঠিকে নিজেদের সভ্যতা, অতীত এবং দার্শনিক অনুভূতির রসাস্বাদন করাতে বিরাট ভূমিকা পালন করে। সৃষ্টির আদি শক্তির প্রতিমূর্তি, জগতের রক্ষাকর্ত্রী দেবী জগদ্ধাত্রী, তাঁর আরাধনার শুভ লগ্নে ভক্তকূলের উপর তাঁর কৃপা ও আশির্বাদ বর্ষণ করতে থাকুন, এটি আমাদের ঐকান্তিক প্রার্থনা। 🙏🙏🙏

সত্ত্বাধিকার: গৌতম ভট্টাচার্য
তথ্যসূত্র: সনাতন পণ্ডিতের পাঠশালা, কেন উপনিষদ (অতুলচন্দ্র সেন), pujaart.com
ছবি : জয়দীপ ফোটোগ্রাফি